Text size A A A
Color C C C C
পাতা

কী সেবা কীভাবে পাবেন

বাংলাদেশে বিনিয়োগ

কৃষি নির্ভর অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শিল্প নির্ভর অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থেকে অনেক কম। দ্বিতীয়তঃ কৃষি নির্ভর অর্থনীতি অল্পতেই সংপৃক্ত(Saturated) হয়ে যায়, অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করলেও সে স্থান থেকে সে হারে আর অতিরিক্ত বিনিময় পাওয়া যায় না, আয়ের পরিমাণ তার সর্বোচ্চ উৎপাদনের স্থানে থেমে যায়। কিন্তু শিল্প নির্ভর অর্থনীতি এভাবে সংপৃক্ত হয় না, একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যত বিনিয়োগ করবেন সাধারণতঃ সে হারে অতিরিক্ত বিনিময় পাওয়া যায়, উৎপাদনের পরিমাণ সাধারণতঃ কৃষির মতো সংপৃক্ত(Saturated) হয় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য শিল্পে বিনিয়োগ অতীব জরুরি। শিল্পে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে রয়েছে অপার সম্ভাবনা।

অর্থনীতিতে নতুন দু’উদীয়মান শক্তি ভারত এবং চীনের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। তন্মধ্যে সিলেট ভারতের ৭টি অঙ্গ রাজ্যের জন্যকৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সহজে এ উদীয়মান দু’শক্তির অভ্যন্তরে তার বাজার সৃষ্টি করতে পারে, যোগানদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে বা নিজেই এ উদীয়মান দু’শক্তির মাঝে আরেকটি শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে শ্রম মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমঘন(Labour Intensive) শিল্পের জন্য বাংলাদেশের স্বল্পমূল্যের শ্রম অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তপার করে একটি বিশাল শ্রম বাজার তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বাজার ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৩-২০০৭ পর্যন্ত বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৯.৬%। বাংলাদেশে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিও ক্রমবর্ধমান। সম্প্রতি এ হার দ্বিগুণ হয়েছে।

বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের রয়েছে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ ও আইন-কানুন। বাংলাদেশে নির্দিষ্ট কতগুলো খাত ব্যতীত অন্যান্য যে কোন খাতে যে কোন পরিমাণ বিনিয়োগ করা যায়, বিনিয়োগে বলতে গেলে কোন বাধা-নিষেধ নেই। বিদেশী বিনিয়োগকে দেশী বিনিয়োগের সমান আইনী অধিকার দেয়া হয়। বিদেশী বিনিয়োগের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হয়, যে কোন পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ করা যায় এবং এ বিনিয়োগ প্রত্যার্পণযোগ্য।

ইউরোপ, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ উন্নত বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের কোটামুক্ত অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে। বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিধান কল্পে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাংলাদেশ অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। এ ছাড়া দ্বৈত কর পরিহারের জন্য ২৮টি রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে।

বাংলাদেশের রয়েছে সামাজিক সাম্য। জাতিগত কোন অস্থিরতা নেই। রয়েছে বিশাল শিক্ষিত যুব সমাজ। দেশের  প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার গড় বয়স মাত্র ৪০, মোট জনসংখ্যার ৫৯.৩% কর্মক্ষম। রয়েছে ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ৫৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১,১৪৩টি কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট। এ সবই একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার জন্য যারা আগামী বিনিয়োগে কর্মশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

দেশী-বিদেশী সকল বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে রয়েছে সহায়ক পরিবেশ, আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা। বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় অন্যান্য যে কোন দেশের তুলনায় বলতে গেলে প্রায় সর্বক্ষেত্রেই কম। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে জেট্রো(JETRO) ২৯টি প্রধান প্রধান অঞ্চল ও শহরে বিনিয়োগ ব্যয় সংক্রান্ত এক সমীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশের শ্রম মূল্য (দক্ষ এবং অদক্ষ উভয়) সবচেয়ে কম, কারখানা, অফিস এবং আবাসিক ভাড়া/ব্যয় অধিকাংশ শহরের তুলনায় কম, জ্বালানি ব্যয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে কম ও প্রতিযোগিতামূলক।

 

বিনিয়োগ সুবিধাদি(Investment Incentives)

বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ বিভিন্ন সুবিধাদি প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সুবিধাসমূহ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে সমানভাবে দেখা হয়। নির্দিষ্ট কতগুলো খাত ব্যতীত বাংলাদেশে যে কোন খাতে যে কোন পরিমাণ বিনিয়োগ করা যায়, বলতে গেলে কোন বাধা-নিষেধ নেই। বিদেশী বিনিয়োগের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হয় এবং তা সম্পূর্ণ প্রত্যার্পণযোগ্য। বিনিয়োগ সুবিধাসমূহ আর্থিক(Fiscal), যেমন- কর মওকুফ, শুল্ক মওকুফ ইত্যাদি এবং অ-আর্থিক(Non-Fiscal), যেমন- বিনিয়োগকারীদের ভিসা-নাগরিকত্ব প্রদান, শিল্প স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ, শিল্প প্লট বরাদ্দ ইত্যাদি।

বিনিয়োগ সুবিধাসমূহ সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ প্রদান করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ  উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  এবং অন্যান্য পোশক(Sponsor) সংস্থাসমূহ সুপারিশকারী(Facilitator) হিসেবে কাজ করে। আর্থিক সুবিধাসমূহ সাধারণতঃ অর্থ বছর নির্ভর হয় এবং অর্থ বছর অনুযায়ী তা পরিবর্তীত হতে পারে। হালনাগাদ বিনিয়োগ সুবিধাসমূহ সম্পর্কে জানার জন্য সংশ্লিষ্ট সুবিধা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযcগ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুবিধাসমূহ নিম্নরূপ-

১. কর মওকুফের সুবিধাঃ বিনিয়োগের স্থান ও খাত ভেদে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কর মওকুফ(Tax Holiday) এর সুবিধা। বিদেশী লভ্যাংশ, কারিগরি ফি, কারিগরি সহায়তা ইত্যাদিতে কর অব্যাহতির(Exemption) সুবিধা। প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কর বিভাগ www.nbr-bd.org

২. শুল্ক হ্রাসের সুবিধাঃ মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ইত্যাদি আমদানিতে শুল্ক হ্রাস সুবিধা। যে সেকল যন্ত্রপাতি-কাঁচামাল-যন্ত্রাংশ এর জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য তা নির্দিষ্ট কোড ভিত্তিক যাকে এইচ.এস কোড (Harmonic System) বলা হয়। প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, শুল্ক ও মূসক কর্তৃপক্ষ www.nbr-bd.org

৩. ত্বরাণ্বিত অবমূল্যায়ন(Accelerate Depreciation) সুবিধাঃ এটি এক ধরনের কর হ্রাসের সুবিধা। কারখানা এবং মূলধনী যন্ত্রপাতিসমূহকে দ্রুত অবমূল্যায়ন করে কর সুবিধা পাওয়া যায়। কারখানা এবং যন্ত্রপাতিসমূহের স্বাভাবিক ক্ষয় হয় তথা এর অবমূল্যায়ন ঘটে। এ অবমূল্যায়ন শিল্পের ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়, ফলে শিল্পের আয় কমে, ফলশ্রুতিতে আয়-করও কমে। এ অবমূল্যায়ন দীর্ঘ সময় ব্যাপী হয় যেমন ১০ বা ২০ বছর। এ অবমূল্যায়ন ত্বরাণ্বিত করে, যেমন যদি যন্ত্রপাতির ক্ষয়কাল ১০ বছরের স্থলে যদি ৩ বছর দেখানো হয়, তবে ১ম তিন বছর কারখানার ব্যয় বেড়ে যায়, ফলশ্রুতিতে এ তিন বছর কম পরিমাণে আয়-কর আরোপিত হয়। এতে সর্বমোট আয়-করের পরিমাণ কমে না, তবে আয়-কর পরিশোধ বিলম্বিত করা হয়। প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কর বিভাগ www.nbr-bd.org

৪. শিল্প আমদানি অনুমতিপত্র(IRC): শিল্প স্থাপনের জন্য শিল্প আমদানি লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এতে শিল্পের প্রয়োজনে কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশ আমদানি করা যায়। শিল্পে ব্যবহারের জন্য কাঁচামাল আমদানির উপর আরোপিত ভ্যাট এর রিবেট পাওয়া যায়। শিল্প IRC এর মাধ্যমে প্রয়োজনে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য আমদানিরও সুযোগ রয়েছে। প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ- প্রধান নিয়ন্ত্রক, আমদানি-রপ্তানি www.ccie.gov.bd, আমদানি ভ্যাট রিবেটের জন্য- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, শুল্ক ও মূসক কর্তৃপক্ষ www.nbr-bd.org

৫. বন্ডেড ওয়্যার হাউস(Bonded Warehous) সুবিধাঃ ১০০% রপ্তানিমুখি শিল্পের জন্য এ সুবিধা। এতে আমানিকৃত কাঁচামাল হ্রাসকৃত বা বিনা শুল্কে অনুমোদিত ওয়্যার হাউস বা গুদামে মজুদ করা হয়, অতঃপর উৎপাদিত পণ্য ওয়্যার হাউসে জমা করে সেখান থেকে রপ্তানি করা হয়। এতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাওয়া যায়। প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কর বিভাগ www.nbr-bd.org

৬. রপ্তানির জন্য আর্থিক সুবিধাঃ রপ্তানি করার জন্য ৫ থেকে ২০% পর্যন্ত নগদ আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়। প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ- বাংলাদেশ ব্যাংক www.bangladesh-bank.org

৭. বিদেশী বিনিয়োগের লভ্যাংশ, কারিগরি ফি ইত্যাদির অর্থ বিদেশে পাঠানো(Remittance) এর সুবিধাঃ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ- বিনিয়োগ বোর্ড www.boi.gov.bd এবং বাংলাদেশ ব্যাংক www.bangladesh-bank.org

৮. বিদেশী বিনিয়োগ সম্পূর্ণ প্রত্যার্পণ(Repatriation) এর সুবিধাঃ বার্ষিক অথবা বর্ধিত সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানি তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলে প্রত্যার্পণ করতে পারে। অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ- বিনিয়োগ বোর্ড www.boi.gov.bd এবং বাংলাদেশ ব্যাংক www.bangladesh-bank.org

৯. বিনিয়োগকারী/বিশেষজ্ঞদের জন্য ভিসা/কাজের অনুমতিপত্রঃ বিদেশী বিনিয়োগকারী এবং কারিগরি সহায়তা এবং বিশেষজ্ঞদের জন্য ভিসা ও কাজের অনুমতি(Work Permit) এর সুবিধা প্রদান করা হয় অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ- বিনিয়োগ বোর্ড www.bida.gov.bd এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ www.dip.gov.bd

এ ছাড়াও রয়েছে আরও অনেক ধরনের সুবিধা। বিস্তারিত তথ্যের জন্য www.bida.gov.bd

 

সম্ভাবনাময় খাত সমূহ(Trust Sectors)

সম্ভাবনাময় খাতসমূহবলতে এমন সব শিল্প খাত যেগুলো বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এ সুবিধা হতে পারে বিদ্যমান কাঁচামাল, শ্রমিক, অবকাঠামো অথবা এমন সব খাত যে গুলোতে বিনিয়োগের জন্য সরকার বিশেষ বাড়তি সুযোগ প্রদান করে; যেমন- বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাময় খাতসমূহ নিম্নরূপ-

১. কৃষি

২. সিরামিক্স

৩. ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী

৪. হিমায়িত খাদ্য

৫. তথ্য প্রযুক্তি

৬. চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প

৭. হালকা প্রকৌশল

৮. প্রাকৃতি গ্যাস নির্ভর শিল্প

৯. ঔষধ শিল্প

১০. জাহাজ নির্মাণ

১১. স্পিনিং ও সুতা প্রস্তুতি

১২. তাঁত ও তৈরি পোষাক শিল্প

১৩. বিদ্যুৎ উৎপাদন

১৪. টেলিযোগাযোগ

১৫. হালকা প্রকৌশল

১৬. সামদ্রিক ও সমুদ্র উপকূলবর্তী শিল্প সমূহ

 

বিনিয়োগ প্রক্রিয়া(Road to Investment)

বিনিয়োগ শুরু করতে নির্ধারিত কতগুলো বিধিগত কাঠামো ও অনুমতি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। বিনিয়োগ করার প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ তথা কোম্পানি গঠন, শেষধাপ বাণিজ্যিক উৎপাদন। ধাপসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নের চিত্রে দেখানো হলো,